রবিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

আল-কুদ্সের মুক্তি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সাম্প্রতিক অন্তরায়সমূহ

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬ 

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ভূমিকা
মক্কার মসজিদুল হারাম বা বায়তুল্লাহ ও মদীনার মসজিদে নববীর পর মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হচ্ছে বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসা। রাসূলুল্লাহ (সা.) যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লে¬খ করেছেন এর অন্যতম হচ্ছে মসজিদ আল-আক্সা। ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নগরীতে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস হচ্ছে মুসলমানদের প্রথম কিবলা। ইসলামের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অসংখ্য নবী-রাসূলের পদধূলিতে ধন্য এ নগরী। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসূলের ঐতিহ্যবাহী মাজার। এ নামটি শুধু একটি স্থানের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং এটি মুসলমানদের ঈমান-আকীদা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এ পবিত্র নগরীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা বিশ্বের প্রতিটি মুমিন মুসলমানের হƒদয়ের গভীরে প্রোথিত।

ঐতিহাসিক পটভূমি
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) কাবাঘর পুনঃনির্মাণের ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ.) জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। হযরত দাউদ (আ.) বায়তুল মোকাদ্দাসে তাঁর আমলের রাজধানী স্থাপন করেন এবং একটি বিশাল ইবাদতখানা নির্মাণে হাত দেন, যা হযরত সুলায়মান (আ.) কর্তৃক জ্বিনদের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। অতঃপর হযরত দাউদ (আ.)-এর পুত্র নবী হযরত সোলায়মান (আ.) জেরুজালেম নগরী পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং মহান আল্লাহর মহিমা তুলে ধরতে সেখানে পুনঃনির্মাণ করে গড়ে তোলেন মসজিদ আল-আকসা। এভাবে বায়তুল মোকাদ্দাসের পবিত্রতার মর্যাদা বাস্তবরূপ লাভ করে। এরপর হযরত ঈসা (আ.)-এর সময় থেকে তাঁর অনুসারীদের এবং মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে মুসলমানদের দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাস পবিত্রতম স্থান রূপে গণ্য হতে থাকে। কোরআন মজিদে বায়তুল মুকাদ্দাসকে পবিত্র ভূমি বলে উল্লে¬খ করে বলা হয়েছে, ‘(স্মরণ করো, মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল) হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন তাতে তোমরা প্রবেশ করো এবং পশ্চাদপসরণ করো না, তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২১)

মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও মিরাজের ঘটনা
মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজের ঘটনার অলৌকিক স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশেপাশের এলাকা। আল্ল¬াহ তাআলা তাঁর কুদরতি নিদর্শনাবলির ব্যাপকতর প্রদর্শনীর লক্ষ্যে নবী করিম (সা.)-কে মিরাজ তথা ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন। এ নৈশভ্রমণের প্রথম পর্ব সংঘটিত হয়েছিল মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্ব ছিল মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বলোক। নিঃসন্দেহে মানবজাতির পরিপূর্ণতা ও মর্যাদার চরমতম নিদর্শন এ পরিভ্রমণে বায়তুল মুকাদ্দাসকে মাধ্যম রূপে মর্যাদা প্রদান এর পবিত্রতার স্বাক্ষর বহন করে। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে এ ভূখ-কে দিকনির্দেশ করে এর পবিত্রতা বা বিশেষ মর্যাদা সম্পর্র্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সায়, যার চতুষ্পার্শ্ব আমি বরকতময় করেছিলাম তাকে আমার নিদর্শন পরিদর্শন করার জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ১)
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২০ আগস্ট ঐতিহাসিক ইয়ারমুকের যুদ্ধের মাধ্যমে খ্রিস্টানদের হাত থেকে মুসলমানেরা এ পবিত্র নগরীর কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। এরপর থেকে ফিলিস্তিন মুসলমানদেরই দখলে থাকে।

ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক অবস্থান ও কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত
ফিলিস্তিন আয়তনগত দিক থেকে তেমন বড় রাষ্ট্র নয়। এর মোট আয়তন মাত্র ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার। অথচ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যাযাবর জাতি ইহুদিদের একটি স্থানে জড়ো করার দাবি তোলে একটি গোষ্ঠী। পাশ্চাত্যের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেন এ ব্যাপারে জোরালো অপতৎপরতা চালায়। মুসলমানদেরকে নিগৃহীত করার হীন উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিদের পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সে লক্ষ্যে তারা নিজেদের প্রত্যক্ষ মদদে মধ্যপ্রাচ্যের পুণ্যভূমি ফিলিস্তিনে ইহুদিদের এনে জড়ো করে। একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জাতিসংঘও এতে সহযোগিতা যোগায়। তখন বলা হয়েছিল এখানে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও গঠন করা হবে।
কিন্তু এরপর থেকে ফিলিস্তিনের সমস্যা দিন দিন ঘনীভূত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ওপর পাশ্চাত্যের আধিপত্যের কারণে ফিলিস্তিনে প্রতিদিনই অকারণে নিষ্পাপ শিশু, অসহায় নারী-পুরুষের রক্ত ঝরছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বুলেটের আঘাতে অসংখ্য মুসলিমের বুক ঝাঁঝরা হচ্ছে। তাদের ঘর-বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে মুসলিম যুবকেরা অস্ত্র হাতে নিয়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদীদের সূক্ষ্ম কুটচালের কারণে ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির দিন দিন চরম অবনতি ঘটছে। ইহুদিবাদীরা বিশ্বাস করে যে, আল-আকসা মসজিদের নিচেই তাদের কথিত ‘টেম্পল অব সোলায়মান’ বিদ্যমান রয়েছে। ইহুদি বিশ্বাসের কথিত উপাসনালয়ের গেট আবিষ্কারের জন্যই সাম্প্রতিককালে আল-আকসা মসজিদের ভিত্তিসমূহের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে তারা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ব্যাপক বসতি স্থাপন এবং ধ্বংসাত্মক ও পরিকল্পিত খনন কাজ শুরু করে দিয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদী চক্রের জবরদখলে প্রতিষ্ঠিত অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল
১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী চক্র ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিকে অন্যায়ভাবে জবরদখল করে প্রতিষ্ঠিত করে নতুন আগ্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইল। এর ফলে স্ব^দেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি জনগণ। ইহুদিবাদী চক্র তাদের দোসর বিশ্বের তৎকালীন সকল পরাশক্তির গোপন ও প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র, প্রশ্রয় এবং বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতায় বিশ শতকের গোড়া থেকেই মুসলিম জাহানের তেল সম্পদ লুটপাট, ভাগ-বাটোয়ারা ও শোষণ-শাসন করার জন্য জঘন্য চক্রান্ত করতে থাকে। অভ্যন্তরীণ ও বহিঃষড়যন্ত্র ও আগ্রাসনের পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর ভেতরেও চক্রান্তমূলকভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করে নিরীহ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর ক্রমান্বয়ে আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী তৎপরতা, গণহত্যা ও বিতাড়ন, জুলুম-নির্যাতন, খুন-জবরদখল ও অবৈধ উচ্ছেদ চাপিয়ে দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরাইল নামক অস্বাভাবিক এক সন্ত্রাসী সরকার ও অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্র গঠনের পর ইহুদিবাদীরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করা শুরু করে। ইহুদিদের নির্মম অত্যাচারে আরবরা জান বাঁচানোর উদ্দেশ্যে দলে দলে ফিলিস্তিন ত্যাগ করতে শুরু করে। ১৯৬৭ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মুসলমানরা পর্যুদস্ত হয় এবং ইসরাইল বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ দখল করে নেয়। আল-আকসা মসজিদ নিয়ে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে অতীতেও কয়েকবার সংঘর্ষ হয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। আল-আকসা মসজিদের অংশবিশেষ আল-মাগরিবা কর্ণারসমূহ এর মধ্যে রয়েছে। এমনকি আল-কুদসের ম্যাপ থেকে আল-মাগরিবাকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়।
ফিলিস্তিনের ভূমিতে বলপূর্বক ইহুদি রাষ্ট্রটি গড়ে তোলার পর আরব জাহানসহ সমগ্র বিশ্বে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পাশ্চাত্যের বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইহুদি মৌলবাদী রাষ্ট্রটিকে শক্তিশালী করে দাঁড় করানোর অপপ্রয়াস চালানো হয়। আরব এলাকায় একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত দ্রুতলয়ে সেটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ও সামরিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পথে অগ্রসর হয়। পাশাপাশি অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর তিলে তিলে জুলুম নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাতে থাকে। জাতিসংঘ, আরব লীগসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ সেই ঘোরতর অন্যায় ও অত্যাচারমূলক কর্মকা-ের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করলেও ইসরাইলের নৃশংস বর্বরতা এতটুকুও হ্রাস পায়নি, বরং দিনে দিনে তা আরো ভয়ংকর রূপ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনিদেরকে সমূলে ধ্বংস করে ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ভূমিতে ইসরাইলি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের পথ তৈরি করেছে।
ইসরাইলি সৈন্যরা প্রবল প্রতাপে ফিলিস্তিনিদেরকে বিতাড়িত করে, আর ইসরাইলি গৃহনির্মাণ ও বসতি স্থাপন সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় সেখানে ইহুদিদের জন্য ঘর-বাড়ি, স্থাপনা তৈরি করে ইসলাইলি রাষ্ট্রের পরিধি বৃদ্ধি করে। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মানচিত্রের দিকে তাকালে প্রতীয়মান হয় যে, দিন দিন ইসরাইল দীর্ঘতর হচ্ছে, আর ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীরের রামাল্লা এবং গাজায় সরু ভূখ-ে সংকুচিত হচ্ছে। তারা শুধু জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন ভূখ-ই নয়, গোটা আরব জাহান দখলেরও গভীর ষড়যন্ত্রের পাঁয়তারা করছে।

ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-এর আপোসের নীতি
১৯৬৪ সালের ২৮ মে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) গঠিত হয় এবং তখন থেকেই এ সংস্থাটি ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামী দল হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ব্যাপক সুনামও অর্জন করে। কিন্তু ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকেই ষড়যন্ত্রের ফলে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-এর সংগ্রামী চরিত্র বিনষ্ট হয়ে যায়। তারা সংগ্রামের পথ পরিহার করে আপোসের নীতি অবলম্বন করে। বিশেষত ১৯৯৩ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সহায়তায় আইজ্যাক রবিন-ইয়াসির আরাফাত চুক্তির মাধ্যমে পিএলও জেরিকো ও গাজা উপত্যকায় কয়েক শত বর্গ কিলোমিটারের একটি ছোট ভূখ-ে সীমিত স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার লাভ করে। বিনিময়ে দখলদার ইসরাইলকে স্বীকার করে নেয় পিএলও। মুসলমানদের জন্য এরচেয়ে চরম লজ্জা ও অপমানের বিষয় আর কি হতে পারে?
ফিলিস্তিন জনগণের মুক্তি সংগ্রামে ‘আল-ইনতিফাদা’ জাগরণ ও বর্তমান পেক্ষাপট
১৯৮২ সালের এপ্রিল মাসে আল-আকসা মসজিদের ভেতরে এক ইসরাইলি সৈন্য যখন গুলি ছোঁড়ে, তখন এরই প্রতিবাদের ফলশ্রুতিতে ‘আল-ইনতিফাদা’ এর আবির্ভাব ঘটে। আরবি ‘ইনতিফাদা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জাগরণ অর্থাৎ দখলদার ইহুদি স্বৈরশক্তির বিরুদ্ধে ইসলামী উত্থান। ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামে ইনতিফাদার আহ্বানে সমগ্র ফিলিস্তিনে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়।
ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামরত জনগণের ঐ তীব্র জাগরণে ষড়যন্ত্রকারী ইসরাইলি জান্তা তাদের দমনের উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং সূচনালগ্ন থেকেই অদ্যাবধি আন্দোলনকারীদের ব্যাপক ধরপাকর শুরু করে এবং তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে ট্যাংক বহরের চাপে গুঁড়িয়ে দেয় ফিলিস্তিনি জনবসতি। এতদসত্ত্বেও ইনতিফাদার সমর্থকদের মূল পূজি হলো ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আর এর সাথে যোগ হয়েছে তাদের ঈমানী মনোবলÑ যা মুসলিম জনগণের আন্দোলনের চেতনাকে আরো শাণিত করেছে।
২০০৬ সালে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সাথে ৩৩ দিনব্যাপী যুদ্ধে পরাজয়বরণ ইসরাইলের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়। এরপর ২০০৮ সালে ইসরাইল গাযায় ২২ দিন ধরে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েও হামাসের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারেনি। বরং হামাসের পাল্টা আক্রমণে ইসরাইলের মনোবলে ফাটল ধরে এবং তারা হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। ফিলিস্তিনি জনগণের বিজয় অর্জিত হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ছয় দিনের যুদ্ধেও তারা ফিলিস্তিনিদের কাবু করতে পারেনি। কঠোর অবরোধ ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের মধ্যেও ফিলিস্তিনিদের এই অর্জন বিশ্ব মুসলিমের মনে আল-কুদ্স মুক্তির আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করেছে এবং তাদেরকে নব উদ্যোমে ফিলিস্তিনের মজলুম জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে।

ইসলামী উম্মাহর অনৈক্য ও সাম্প্রতিক অন্তরায়সমূহ
সাম্প্রতিক কালে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ধরনের সমস্যার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় যে ঐতিহাসিক কারণ কাজ করেছে তা হলো মুসলমানদের সুদৃঢ় ঐক্যের ফাটল। মুসলমানদের ঈমানী ও আমলী চরম দুর্বলতার সুযোগে ইসলামী উম্মাহর মধ্যে ভয়াবহ অনৈক্য সৃষ্টি করে বৈশ্বিক সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তিসমূহ তাদেরকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূখ-গত দিক থেকে চরমভাবে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত করে আসছে। ষড়যন্ত্রকারী আন্তর্জাতিক ইহুদি ও খ্রিস্টান চক্র মুসলমানদের মধ্যে আরব-অনারব, তুর্কি-পারসি, শিয়া-সুন্নি প্রভৃতি জাতিগত বিভাজনী উপাদান ছড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে আজ খ–বিখ- করে ফেলেছে; যা স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের উদ্ধার ও আল-কুদ্স মুক্তির পথে বিরাট অন্তরায় ও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গ ও ইহুদিবাদী চক্র শুধু ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ক্ষেত্রেই তাদের ষড়যন্ত্র সীমাবদ্ধ রাখে নি। তারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। প্রচুর অর্থসম্পদ ব্যয় করে কখনো আল-কায়েদা আবার অতিসম্প্রতি ইসলামী রাষ্ট্র (আইএস) প্রভৃতি নামে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে জিহাদের নামে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ তথা গোপনে ও প্রকাশ্যে ইসলাম ও মানবতাবিরোধী হত্যাযজ্ঞের ন্যায় নৃশংস ও জঘন্য বর্বরতম কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাসমূহ ইসরাইলের স্বার্থে তাদের জুলুমের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন নতুন দল ও উপদল সৃষ্টি করে সমরাস্ত্র, অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে যুদ্ধের বিস্তার ঘটানোর মাধ্যমে মুসলমানদের শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টায় নিয়োজিত হয়েছে।
এমতাবস্থায় মুসলিম উম্মাহর উচিত ইহুদিবাদীদের গভীর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তাদের প্রচার-প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে আল-কুদসের মুক্তি সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পারস্পরিক সুদৃঢ় ঐক্য, সম্প্রীতি ও সার্বক্ষণিক সতর্কতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। ওআইসি, আরব লীগসহ সকল স্বাধীনতাকামী ও মানবাধিকারবাদী গোষ্ঠীর ফিলিস্তিনিদের দাবির প্রতি সমর্থন জানানো ও তাদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা উচিত।

‘বিশ্ব আল-কুদ্স দিবস’ পালনের ঘোষণা
আল-কুদ্স পুনরুদ্ধারে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিপ্লবী বীর, অবিসংবাদিত জননেতা মরহুম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ ইমাম আল-খোমেইনী (র.)-এর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। সত্তর দশকের শেষদিকে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভের পরপরই তিনি আল-কুদ্সের গুরুত্ব অনুধাবন করে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যাতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন সেজন্য মাহে রমজানের চতুর্থ ও শেষ শুক্রবারকে ‘বিশ্ব আল-কুদ্স দিবস’ পালনের ঘোষণা দেন। সেই থেকে প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বের মুসলমানেরা ইহুদিদের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের কবল থেকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে মুক্ত করার জন্য পুনরায় দৃঢ় শপথ গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশেও ‘আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে প্রতিবছর মাহে রমজানের শেষ শুক্রবার সেমিনার, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বিক্ষোভ, মানব বন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়।

ইসলামী উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশের জন্য সর্বাত্মক গণআন্দোলন
সুদীর্ঘ প্রায় ৬০ বছরের বেশি মুসলমানদের এ পবিত্র মসজিদ আল-আক্সা ইহুদিরা জবরদখল করে আছে। অসহায় ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ দীর্ঘদিন ধরে তাদের আবাসভূমি ও আল-কুদ্স তথা বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আল-কুদ্স মুক্তি এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে শান্তিপূর্ণ সমাধানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মুসলিম বিশ্বের ইস্পাতকঠিন ঐক্য। এবারের আল-কুদ্স দিবসে বজ্রকঠিন ধ্বনিতে দৃপ্ত শপথ হোক মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইলকে সমাধিস্থ করে ফিলিস্তিন ও আল-কুদ্সের আশু মুক্তি। পবিত্র আল-কুদ্স পুনরুদ্ধার ও ষড়যন্ত্রের কবলে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের আন্দোলনকে উচ্চকিত ও বেগবান করতে সারা দুনিয়ার আলেমসমাজ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে ‘আল-আকসা’ মসজিদ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে ধিক্কার জানানোর জন্য সর্বাত্মক গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতে সোচ্চার হতে হবে। মুসলিম উম্মাহ সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে অগ্রসর হলে আল-কুদ্সকে মুক্ত করা অসম্ভব নয়। অবশ্য বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের জন্য পৃথিবীর সকল জাতিকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা সকলে আল্ল¬াহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১০৩)
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবিসংবাদিত আধ্যাত্মিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ ইমাম আল-খোমেইনী (র.) উদাত্তকণ্ঠে আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘কুদ্স দিবস কেবল ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, এটা ইসলামের দিবস, এটা ইসলামের সরকারসমূহের দিন, এটা এমন দিন যে সেদিন সকল দেশে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হবে।’
তাই রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ‘আল-কুদস দিবস’ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। মাহে রমজানের সমাপনীসূচক জুমআর নামাজে মসজিদে মসজিদে বিশেষ মুনাজাতে রোজাদার মুসল্লিরা দেশ-জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং ইসলামী উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, শান্তি ও কল্যাণ সর্বোপরি আল-কুদ্সের মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে পরম ভক্তি ও আন্তরিকতা সহকারে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মজলুম ফিলিস্তিনি অসহায় মুসলমানদের ষড়যন্ত্রকারী বর্ণবাদী ইহুদিদের অকথ্য নির্যাতনের কবল থেকে আশু মুক্তি দান করুন! আমীন!!

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সাংগঠনিক সম্পাদক, আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশ। সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। ইসলাম বিষয়ক উপদেষ্টা, দৈনিক প্রথম আলো। ফৎ.সঁহরসশযধহ@ুধযড়ড়.পড়স