সোমবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

আন্তর্জাতিক আল-কুদস দিবস ও এর তাৎপর্য

পোস্ট হয়েছে: জুন ২৪, ২০১৭ 

news-image

মুজতাহিদ ফারুকী: পবিত্র মাহে রমযানের শেষ শুক্রবার আন্তর্জাতিক ‘আল-কুদস দিবস’। দীর্ঘদিন ধরে ইহুদীবাদী ইসরায়েলের দখলে থাকা মুসলমানদের প্রথম ক্বিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস পুনঃরুদ্ধারের দাবিতে প্রতিবছর রমযানের শেষ শুক্রবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় দিনটি।

জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমাবার সর্বাধিক মর্যাদাবান ও নেতৃত্বস্থানীয় দিন। এ পুণ্য দিনে আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এদিন তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। এদিনই তিনি পৃথিবীতে আগমন করেন। এদিন তাঁর ইন্তেকাল হয়। এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ পুণ্য দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যে সময় আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হয়।’ (মিশকাত)

আবার জুমাতুল বিদার বিশেষ তাৎপর্য এই যে রমজান মাসের শেষ শুক্রবার আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ.)-এর পুত্র মহামতি হযরত সুলায়মান (আ.) জেরুজালেম নগর প্রতিষ্ঠা করেন এবং আল্লাহর মহিমা তুলে ধরতে সেখানে পুনর্নির্মাণ করে গড়ে তোলেন ‘মসজিদ আল-আকসা’। মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববির পর মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হচ্ছে ‘বায়তুল মোকাদ্দাস’ বা ‘মসজিদ আল-আকসা’।

মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে মুসলমানদের কাছে বায়তুল মোকাদ্দাস পবিত্র স্থান রূপে গণ্য হতে থাকে। কোরআন শরিফে বায়তুল মোকাদ্দাসকে পবিত্র ভূমি বলে উল্লেখ করা হয়েছে, “(স্মরণ করো, মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল) হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন, এতে তোমরা প্রবেশ করো এবং পশ্চাদপসরণ করো না, করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।” (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২১)

ফিলিস্তিন ও পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস দখলদার ইহুদিবাদীদের হাত থেকে মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা মসজিদ মুক্ত করার জন্যে মুসলমানদের জাগিয়ে তোলাই আল-কুদস দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ ছাড়াও মজলুম ফিলিস্তিনী জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ইহুদিবাদী শাসন, শোষণ, নিপীড়ন ও তাদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের অবসান ঘটানো এবং বায়তুল মোকাদ্দাসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনী জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও এ দিবসের আরেকটি বড় লক্ষ্য। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের পোশাকধারী সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নব্য ক্রুসেড মোকাবিলার জন্য মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম বা প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলামী শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যও এ দিবস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে কেন আল আকসা মসজিদ এবং ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করা মুসলমানদের জন্যে এতো গুরুত্বপূর্ণ?

একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারবো বায়তুল মোকাদ্দাস, আল আকসা মসজিদ এবং ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করা মুসলমানদের জন্যে সবচেয়ে বড় ও সর্ব প্রধান দায়িত্ব। এটা শুধু মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব বা মান সম্মান ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন নয়। বিশ্বব্যাপী সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যেও এটা জরুরী। কারণ,বায়তুল মোকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন হচ্ছে রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক কৌশলগত দিক থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা- এই গুরুত্বপূর্ণ তিন মহাদেশের প্রবেশদ্বার। তাই এ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি যদি সা¤্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রধান তিন মহাদেশের ওপর কর্তৃত্ব করা সা¤্রাজ্যবাদীদের জন্যে সহজ হবে। এরপর রয়েছে পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস শহর ও আল আকসার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে ঐ অঞ্চলের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্তভাবে হলেও জেনে রাখা দরকার।

বায়তুল মোকাদ্দাস শহর নির্মিত হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম (আঃ)’র মাধ্যমে কাবা শরীফ নির্মাণের ১১০০ বছর পর তথা হযরত ঈসা (আঃ)’র জন্মের ৯৭০ বছর আগে। তাই ইব্রাহীম (আঃ)র বংশধর হযরত দাউদ (আঃ)’র মাধ্যমে নির্মিত আল আকসা মসজিদ তৌহিদপন্থীদের দ্বিতীয় হারামে পরিণত হয়।

হযরত মূসা (আঃ)’র জীবদ্দশাতেই ইহুদিরা তৌহিদবাদ বা আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে মূর্তিপূজা শুরু করেছিল এবং আল্লাহর শাস্তি হিসেবে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। এরপর ইহুদিরা অনেক নবীকে হত্যা করেছিল।

ইহুদিবাদীরা দাবি করে যে বায়তুল মোকাদ্দসে হযরত সোলায়মান (আঃ)এর তৈরি ইবাদত ঘরটি রয়েছে । অথচ খৃষ্টপূর্ব ৭০ সালেই রোমান সেনারা সেটি ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং বর্তমান আল আকসা মসজিদ থেকে তার অবস্থান ছিল অনেক দূরে। ফিলিস্তিন রোমানদের কর্তৃত্ব থাকার সময়ে সে অঞ্চলের জনগণের মুক্তিদাতা হিসেবে হযরত ঈসা (আঃ)’র জন্ম হয়। কিন্তু তৎকালীন ইহুদি পুরোহিতরা বায়তুল মোকাদ্দাসের ইবাদত ঘরে হযরত ঈসার যাতায়াতে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। কারণ, তিনি জনগণের কাছে একত্ববাদী শিক্ষা প্রচার করতেন। ক্ষুব্ধ ও পথভ্রষ্ট ইহুদি পুরোহিতরা রোমান শাসককে হযরত ঈসার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে এবং তাঁকে ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)কে রক্ষা করেন এবং তাঁকে এখন পর্যন্ত গায়েবী বা অদৃশ্য অবস্থায় জীবিত রেখেছেন। কিন্তু খ্রিস্টানরা মনে করে হযরত ঈসা ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে মারা যান। আর এ জন্যে তারা ইহুদিদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। হযরত ঈসা (আঃ) অদৃশ্য হবার পর খৃষ্টীয় ৭০ সনে রোমানদের হামলায় বিপর্যস্ত ইহুদিরা আশ্রয়হীন ও শরণার্থীতে পরিণত হয়। খৃষ্টীয় তৃতীয় শতকে রোম স¤্রাট কনস্টানটিন নিজে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এ সময় তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী বেথেলহামে ঈসার (আঃ) মাজার থাকায় এবং এ শহরটি তাঁর জন্মস্থান হওয়ায় বায়তুল মোকাদ্দাস খ্রিস্টানদের কেন্দ্রীয় শহর হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। খৃষ্টীয় ১৩৫ সন থেকে ৫০০ সন পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দসে হাতে গোনা অল্প ক’জন ইহুদি বসবাস করতো।

এরপর মসজিদুল আকসা ছিল বিশ্বনবী (সাঃ)’র নবুওতের প্রথম চৌদ্দ বছর পর্যন্ত মুসলমানদের প্রথম কেবলা। ইহুদিদের কেবলার দিকে মুখ করে মুসলমানরা নামাজ আদায় করতো বলে ইহুদিরা মুসলমানদের উপহাস করতো। শেষ নবী (সাঃ) কেন ইহুদি বংশে জন্ম নিলেন না এটাই ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদিদের ক্ষোভের একটা বড় কারণ! এ অবস্থায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানরা পবিত্র কাবাকে নামাজের কেবলায় পরিণত করে। দ্বিতীয় খলিফার সময় বা ১৫ হিজরীতে বায়তুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের হস্তগত হয়। পরবর্তিতে এ শহরের বেশীর ভাগ বাসিন্দাই ছিলেন আরব মুসলমান। আর তাঁদেরই বংশধর হলেন আজকের ফিলিস্তিনী মুসলমান। এরপর খৃষ্টীয় ১০৯৫ সালে ইউরোপীয়রা বায়তুল মোকাদ্দাস দখলের জন্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড শুরু করে। প্রায় দু’শ বছর পর্যন্ত ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাত আটটি ক্রুসেড যুদ্ধ পরিচালনা করে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর হাতে ক্রুসেডাররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল।

আইয়ুবী বংশের পর মামলুক এবং এরপর উসমানী খেলাফতের আয়ত্বে ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। ওসমানী শাসনাধীন তুরস্ক প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত হলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ফিলিস্তিন বৃটেনের দখলে চলে আসে। এ সময় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চাশ হাজার। এ সংখ্যা ছিল ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার মাত্র সাত শতাংশ। এরপর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহিরাগত ইহুদিদেরকে কিভাবে ছলে বলে কৌশলে ফিলিস্তিনে জড়ো করে এবং ফিলিস্তিনীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ও গণহত্যা চালিয়ে সেখানে জোর করে ইসরাইল নামের একটি অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তা সবারই জানা। ইতিহাসের পরিহাস হলো যে খ্রিস্টানরা দাবি করে থাকে তাদের ধর্মের প্রবর্তক হযরত ঈসা (আঃ)’কে কুচক্রী ইহুদি পুরোহিতরাই হত্যা করেছিল বা হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। অথচ পরবর্তীকালে তাদেরই উত্তরসূরি ইহুদিবাদীদেরকে খ্রিস্টান নামধারী সা¤্রাজ্যবাদীরাই ফিলিস্তিনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিল। এ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে আমরা বলতে পারি যে, প্রকৃত ইহুদি ও প্রকৃত খ্রিস্টানরা বায়তুল মোকাদ্দাস শহরকে তাদের জন্যে পবিত্র শহর বলে দাবি করতে পারে, কিন্তু তারা এটা বলতে পারে না যে এ শহর বা গোটা ফিলিস্তিন একমাত্র তাদেরই অধিকারে থাকবে।

বিশেষ করে, ইহুদিরা সব সময় ফিলিস্তিনে সংখ্যালঘু ছিল এবং ফিলিস্তিনের দ্বিতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা খ্রিস্টানদের চেয়েও তাদের সংখ্যা কম হওয়ায় তারা এ শহর বা অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্বের দাবি করার কোনো অধিকারই রাখে না। অন্যদিকে, কয়েকহাজার বছর ধরে ফিলিস্তিনে বসবাসরত সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হিসেবে ফিলিস্তিনীরাই এ অঞ্চলের প্রকৃত আদিবাসী হিসেবে পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাসসহ গোটা ফিলিস্তিনের ওপর শাসন প্রতিষ্ঠার অধিকার রাখেন। হযরত রাসুলে করীম (সাঃ) মক্কার মসজিদুল হারাম, মদীনার মসজিদুন্নবী ও বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের উদ্দেশে সফরকে মুসলমানদের জন্য বিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা অন্য কোন মসজিদ সম্পর্কে করেন নি।

বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশে পাশের এলাকা বহু নবীগণের স্মৃতি বিজড়িত। এই পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সাথে জড়িত নয় বরং এই নাম সকল মুসলমানের ঈমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসুলের মাযার। ওহী ও ইসলামের অবতরণস্থল এ নগরী নবীগণের দ্বীন প্রচারের কেন্দ্রভূমি। তাই এ পবিত্র নগরীর প্রতি ভালবাসা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র) পবিত্র রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে কুদ্স দিবস ঘোষণা করেন। সেই থেকে ইরানসহ বিশ্বের বহু দেশে কুদ্স দিবস পালিত হয়ে আসছে এবং দিন দিন কুদ্স পালনকারী দেশের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার বা ‘জুমাতুল বিদা’র দিনে সারা বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান বায়তুল মোকাদ্দাস তথা আল-কুদসে ইহুদিদের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের কবল থেকে পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মুক্ত করার জন্য নতুন শপথ গ্রহণ করেন। এটি হলো ইহুদিবাদী ইসরাইলের স্বরূপ তুলে ধরে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানোর দিবস। আলকুদস মুক্তির লক্ষ্যে সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের একতাবদ্ধ হবার দিবস। ইসরাইলের পতন কামনার দিবস। এই দিবস এলেই থরথর করে কাঁপে ইসরাইল। এই দিবস এলেই ইসরাইলের অবৈধ সত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। আসুন আমরা সবাই ইসলামের পরম শত্রু ইসরাইলের পতন কামনা করে সমস্বরে বলি: ‘অবৈধ ইসরাইল নিপাত যাক। আল কুদস মুক্তি পাক’।