মঙ্গলবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

অলংকরণ বিদ্যায় আরবি লিখনশৈলী

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৫ 

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

সৃষ্টিশীল মানবজাতির ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসে আমরা আমাদের মনের ভাব ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকি। শিশুরা তাদের মায়ের ভাষায় কথা বলতে শিখে এবং এ মায়ের ভাষা হতে পৃথিবীর সবকিছুকে অনায়াসে জানতে, বুঝতে কিংবা চিনতে শিখে। ভাষা শিখবার জন্য তাদের কোনো প্রকার ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। ভাব-বাচনক্ষমতা মানুষ জন্মসূত্রে পায়। মনের ভাব প্রকাশের জন্য পৃথিবীর একেক জাতি একেক ধরনের ভাষা ব্যবহার করে এবং ভাব প্রকাশ করার জন্য নানা প্রকৃতি বা প্রতীকীর আক্ষরিক চিহ্নের সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে।

জগতে বর্ণমালা আবিষ্কার হবার অনেক পূর্বে অতি প্রাচীনকালে মানুষ নানারূপ সাংকেতিক চিহ্ন কিংবা নানা জীবজন্তুর মটিফ আকারে তা প্রকাশ করত। এ সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারকে লিপি বিজ্ঞানীরা হায়ারোগ্লিফ্‌স (Hieroglyphs) নামে আখ্যা দিতেন। সে সময় এ পদ্ধতি এশিয়া মাইনর, সিরিয়া ও সিনাই দ্বীপে প্রচলিত ছিল। ব্যাবিলন হতে প্রাপ্ত পাথর এবং ইটের ওপর একপ্রকার কীলকাকার প্রতীক চিহ্নের ব্যবহার করা হতো। এ পদ্ধতিকে লিপিবিজ্ঞানীরা কিউনিফরম (Cuneform) বলতেন।

আধুনিক লিপিবিজ্ঞানী বা পণ্ডিতগণের মতে ফিনিসিয়ার অধিবাসীরা মিশরের হায়ারোগ্লিফ্‌স লিখন পদ্ধতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বর্ণমালাভিত্তিক লিখন পদ্ধতির সূচনা করেছিল। তবে ফিনিসীয় বর্ণমালাভিত্তিক লিখন পদ্ধতি ও হায়ারোগ্লিফ্‌স পদ্ধতির মধ্যে বিরাট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সম্ভবত সিনাই উপদ্বীপে খ্রিস্টপূর্ব দুই সহস্র বছর আগে সিনাই তীরস্থ বর্ণমালা মিসরীয় হায়ারোগ্লিফ্‌স এবং ফিনিসীয় বর্ণমালাভিত্তিক লিখন পদ্ধতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছিল। যেমন : হায়ারোগ্লিফ্‌স পদ্ধতিতে ষাঁড়ের মাথা ফিনিসীয় ভাষায় ‘আলিফ’ অক্ষরের প্রতীক চিহ্নের মতো পরিলক্ষিত হতো।

আরবি লিপির উতপত্তি

ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য হতে জানা যায় যে, প্রথম বর্ণমালা সেমিটিক জাতির হাতে আবিষ্কৃত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব আঠারো শতকের শিলালিপিতে সেমিটিক আদিরূপ লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীকালে এ সেমিটিক লিপি উত্তর ও দক্ষিণ এ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তর সেমিটিক লিপি হতে আবার আর্মায়িক, ক্যানানাই এবং গ্রীক লিপি এ তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এ আর্মায়িক লিপি হতে আরবি লিপির উতপত্তি।৩  অপরদিকে অনেক ঐতিহাসিকের মতে, আরবি লিপির উদ্ভাবনে ফিনিকীদের স্থান ছিল শীর্ষে। আরবরা বেদুঈন থাকার কারণে তারা এই আরবি লিপি সম্পর্কে মোটেই ওয়াকেফহাল ছিল না। ফিনিকীদের লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে আরামিগণ এ পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে আয়ত্তে নিয়ে নতুন ‘আল-মুসুনদুল আরামি’ নাম দিল এবং পরবর্তীকালে ‘হুরানে আল-খাত্তুন্নাবাতী’ ও ইরাকে ‘আস্‌সতরূন্নাহিলী আস্‌সুরইয়ানী’ নামক দুই ভাগে ভাগ হলে এই দ্বিতীয় ধারাই আরবি লিপির মূল উতস বলে জানা যায়।

ইসলামের আবির্ভাবের কিছুকাল আগে হিরার অধিবাসীরা নাসাই ধর্মের অনুসারী ছিল। সেখানে সুরইয়ানী সংস্কৃতির ছিল জয়-জয়কার। নাবাতি লিপির প্রচলন তাদের মধ্যে ছিল খুবই কম। এতে সহজে অনুমেয় যে, হিরার অধিবাসীরা তা থেকে আরবি লিপির উদ্ভাবন করেছে। হিজাজসহ বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত লিপি নিদর্শন থেকে এ তথ্য জানা যায় যে, আরামি লিপি (আর্মায়িক লিপি) নাবাতি লিপি, আরবি লিপির আকৃতি ধারণ করেছে। মুসলিম ঐতিহাসিকগণের মতে, পৃথিবীর আদি মানব হযরত আদম (আ.) সর্বপ্রথম কাদা-মাটি দিয়ে আরবি সুরইয়ানী এবং অন্যান্য ভাষার বর্ণমালা তৈরি করে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়ে শক্ত করেন। কথিত আছে যে, হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সময় আরবি ছাড়া সকল ভাষা হারিয়ে যায়। পরবর্তীকালে এ বর্ণমালা হযরত ইসমাঈল (আ.) কর্তৃক কিছুটা মার্জিত হয়। অতঃপর তাঁর সন্তানরা তাঁর এই আরবি বর্ণমালা শিক্ষা লাভ করেন। অপরদিকে ঐতিহাসিক মাসউদির মতে, মাদায়েনের বনু মুহসিন প্রথম আরবি লিপি ব্যবহার করে। উল্লেখ্য যে, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, আরবি বর্ণমালা এক মূল শামী বর্ণমালা হতে উদ্ভূত।

আরবি লিপির সঠিক মত এই যে, আরবি লিপি হিজাজেই উন্নতি লাভ করে এবং বাণিজ্যের প্রয়োজনে হিজাজের অধিবাসীরা মাঈনি লিপি গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে লেহয়্যানি, সামুদি এবং সফুরি নামক লিপিতে পরিবর্তিত হতে থাকে। নাবাতিদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর আরামি বা আর্মায়িক লিপি গ্রহণ এবং সংস্কারের পর আরবি লিপির উতপত্তি হয়।

আরবি লিখনপদ্ধতির ইতিহাস

আরবি লিখনপদ্ধতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট উতস বা মত পাওয়া না গেলেও বর্ণিত তথ্যের আলোকে এটুকু বলা যায় যে, পৃথিবীর আদি পুরুষ হযরত আদম (আ.) আরবি, সিরীয় এবং অন্যান্য ভাষার বর্ণমালা উদ্ভাবন করে এই সবের মধ্যে ভাব আদানপ্রদান করেন। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তাআলা আদি পুরুষ হযরত আদম (আ.)-কে একে একে বিশ্বের সকল প্রাণী ও বস্তুর নাম এবং সেসবের প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত করান। অতঃপর আদম (আ.)-এর পুত্র হযরত শীষ (আ.) আরবি বর্ণ ও অক্ষরের কিছুটা উতকর্ষ সাধন করেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, হযরত ইসমাঈল (আ.) মাত্র ১৪ বছর বয়সের সময় আরবি বর্ণমালায় লিখনপদ্ধতি চালু করেন। উপরিউক্ত দুটি মতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বলা যায়, অনেক পরে হযরত আদম (আ.)-এর আরবি বর্ণমালা হযরত ইবরাহীম (আ.) সংস্কার করেন। অতঃপর আবারো হযরত ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক প্রবর্তিত আরবি লিপির প্রকৃত রূপদান করেন হযরত ইসমাঈল (আ.)। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর অপর পুত্র হযরত ইসহাক (আ.) ও তাঁর বংশধরগণ সিরীয় বর্ণমালা ও আরবি ভাষার বিকাশ সাধন করেন। কারো কারো মতে আরবি লিপির উদ্ভব হয়েছে হযরত ইদরীস (আ.)-এর সময়, যিনি মাকালি বৈশিষ্ট্যের লিখনপদ্ধতিতে লিপির পূর্ণরূপ দান করেছেন।১০

আরবি বর্ণমালা তার পূর্ণরূপ পাবার পর প্রয়োজন অনুসারে সংকোচন ও সম্প্রসারণ করে ত্বরিত লেখার কাজ সমাধা ও অলংকরণের মাঝে ব্যবহার করার প্রেক্ষিতে সুন্দর হস্তলিখন পদ্ধতির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সাধিত হয়েছে। আরবি লিখনশৈলীর দ্রুত উন্নয়ন সাধনে লিপিকারদের অনেক বেশি ভূমিকা ছিল।

ইসলামের প্রাথমিক যুগ হতে কালক্রমে সুন্দর হস্তলিপি প্রশংসিত শিল্প হিসেবে ইসলামী আইনে অনুমোদনে সবার কাছে সমাদৃত হচ্ছে। হুসনে খাত বা সুন্দর হস্তলিখনের অধিকারী ব্যক্তি সমভাবে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাও লাভ করতেন। ক্যালিগ্রাফি বা অলংকৃত হস্তলিপির লিখনশিল্প উদ্ভবের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে লিপিকার কর্তৃক লেখার মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষণ পদ্ধতিকে উপস্থাপন করা যায়। মহানবী (সা.)-এর কাছে আল্লাহপ্রদত্ত ঐশীবাণীসমূহকে লিপিকার দ্বারা সুন্দর হস্তলিপির মাধ্যমে লিখে রাখা হতো। আর এ লিখনের সমষ্টিই হলো আল-কুরআন। সে সময় এ সুন্দর হস্তলিপিকারকে সামাজিক উচ্চতর মর্যাদা প্রদান করা হতো। মহানবী (সা.) উল্লেখ করেছেন : ‘ঐ ব্যক্তি বেশি উপার্জন করতে পারে যার হস্তাক্ষর সুন্দর।’১১ কুরআন মজীদে উল্লেখ আছে : ‘হে মুহাম্মাদ! তুমি তোমার প্রতিপালকের নামে পাঠ কর, যিনি তোমাকে কলমের সাহায্যে শিক্ষা দান করেছেন।’১২ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : ‘আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম যে বস্তুটি সৃষ্টি করেন তা হলো কলম।’১৩ কুরআনের ভাষা আরবি হবার কারণে প্রাক-ইসলামী যুগের লিপিকারদের দ্বারা কুরআনের ঐশীবাণীসমূহ লিখে রাখা শুরু হয়। অতঃপর মুসলিম শাসকগণ হস্তলিখন শিল্পীদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছেন। ততকালীন রাষ্ট্রীয় শাসকগণ তাঁদের উচ্চতর বেতন, সামাজিক মর্যাদা, পদমর্যাদা এবং অত্যুতকৃষ্ট লেখনির জন্য অতি সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করেছেন অর্থাত ততকালীন যুগে যাঁর হস্তাক্ষর তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল তাঁকেই অধিক সম্মানের চোখে দেখা হতো।

এ সুন্দর হস্তলিখনশৈলী দিয়ে মহানবী (সা.)-এর সময় হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্র লিখা হয়েছিল। শুদ্ধ ও সাবলীল আরবি ভাষায় এবং স্পষ্ট হস্তাক্ষরে পারস্যের সম্রাট খসরু পারভিজ, রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস এবং মিশরের শাসক মুকাওকাসের নিকট দূত মারফত মহানবী (সা.) ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেছিলেন।১৪ সম্ভবত মহানবী (সা.)-এর আমলে কুরআনের অবতীর্ণ অহীকে কুফী লিখনপদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আরবি লিখনপদ্ধতি

পৃথিবীতে যুগে যুগে যত ভাষা সৃষ্টি হয়েছে তার ক্রমবিকাশও হয়েছে সাথে সাথে। তেমনি আরবি ভাষায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি কোনো কালে। কালের বিবর্তনে সৃষ্টি হয়েছে আরবি লিখনের নানা পদ্ধতি। সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটির ওপর আলোকপাত করা হলো।

প্রাথমিক পর্যায়ে তিন প্রকারের লিখনপদ্ধতি প্রচলিত ছিল। যেমন মুদাওয়ার (গোলাকার), মুসাল্লাস (ত্রিকোণাকৃতি) এবং তাইম (গোলাকার ও ত্রিকোণাকৃতির সংমিশ্রণ)। মুদাওয়ার এবং মাবসুত বা কৌণিক লিখন পদ্ধতি আরবি লিপিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।

খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে আর্মেনীয় লিখনশৈলী হতে গোলাকার নাবাতীয় লিখনপদ্ধতির সৃষ্টি হয় যা পরবর্তীকালে উত্তর আরবে সাবলীল আরবি লিখনশৈলীতে পরিবর্তিত হয়। উল্লেখ্য যে, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রারম্ভে নাবাতীয় বর্ণমালা হতে আরবি বর্ণমালার উদ্ভব হয়েছে।১৫ অপর সূত্র অনুযায়ী সিরীয় লিখনপদ্ধতি আরবি লিখনপদ্ধতির উতপত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।১৬

এই গোলাকার লিখনপদ্ধতি অনেক সময় নাস্‌খ নামেও অভিহিত হতো। প্রাথমিক পর্যায়ে আরবি লিপিকৌশল নাবাতীয়দের গোলাকার এবং কৌণিক লিখনশৈলী হতে উদ্ভূত হয়েছে। তবে আরবি লিপি কোনোভাবে তার স্বকীয়তা হারায়নি। গোলাকার আরবি লিখনপদ্ধতির বিকাশে ইবনে মুকলাকে১৭ আকলামুসসিত্তা বা ছয়টি পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসাবে গণ্য করা হয়। তাঁর উদ্ভাবিত লিখনপদ্ধতি চরম বিকাশ লাভ করেছিল। ক্রমান্বয়ে লেখার পরিধি বেড়ে গেলে দ্রুতি ও সহজ গতিতে লেখার অত্যধিক প্রয়োজনীয়তার কারণে সম্ভবত ৩১০ হিজরিতে বৃত্ত ও বিন্দুকে সামনে রেখে সুল্‌স, নাস্‌খ, মুহাক্‌কাক, রায়হান, তাহকী এবং রিকা নামক ছয়টি আরবি লিখনপদ্ধতির আবিষ্কার করে ফেলেন।১৮ আধুনিক পণ্ডিতগণের অনেকে নাস্‌খ ব্যতীত অপর পাঁচটি পদ্ধতিকে নাস্‌খের ভিন্নরূপ এবং লিখনশিল্পের অলংকরণ পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করেন।১৯

নাবাতীয় লিখনপদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণ ও অক্ষরের প্রকৃতি সাধারণত গোলাকার এবং সিরীয় লিখনপদ্ধতিতে স্বরচিহ্ন অক্ষরের পৃথক্‌করণের জন্য নোকতা বা বিন্দু এবং শব্দ বিন্যাসের পদ্ধতি পরিলক্ষিত হয়। মাকালী পদ্ধতির লিখন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গোলাকার অক্ষরের অনুপস্থিতি এবং লম্ব ও উল্লম্ব দণ্ডের ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।২০ আরবি বর্ণমালায় লম্ব দণ্ডের জন্য মাকালী পদ এবং গোলাকার আকৃতির জন্য নাবাতীয় পদ্ধতি এবং স্বরচিহ্ন ও অক্ষর প্রভৃতি পৃথক্করণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কৌশলে সিরীয় লিখনপদ্ধতি উতস হিসেবে গৃহীত হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।

নাস্‌খ ও সুল্‌স লিখনপদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণের ঋজু দণ্ড এবং গোলাকার রেখার পরিমাণ সাধারণভাবে একই রূপ। উভয় পদ্ধতিতে আনুপাতিকভাবে বক্রাকৃতি ও গোলাকার বর্ণ এক তৃতীয়াংশ এবং লম্বদণ্ড ও ঋজু বর্ণ হবে দুই তৃতীয়াংশ। তবে সুল্স পদ্ধতিতে ব্যবহৃত অক্ষর হবে জলী বা স্পষ্ট প্রকৃতির এবং নাস্‌খ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণ হবে আনুপাতিকভাবে খদী বা ক্ষীণ ও সরু। কেউ কেউ মনে করেন যে, বক্রাকৃতি বর্ণ ও ঋজু দণ্ড সুল্‌স পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বক্রবর্ণ ও ঋজু রেখার তিনগুণ হবে। মুহাক্কাক ও রায়হান পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ঋজু দণ্ড এবং বক্রাকৃতি রেখা ও আনুভূমিক বাহুর আনুপাতিক ব্যবহার হবে যথাক্রমে তিন চতুর্থাংশ এবং এক চতুর্থাংশ। মুহাক্‌কাক পদ্ধতির লিপি হবে বলিষ্ঠ, স্পষ্ট এবং কলমের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা যায়। রায়হান পদ্ধতিতে লিপি হতো সরু এবং কম কালি ব্যবহৃত হতো। তাও ও রিকা লিখনপদ্ধতিতে আনুপাতিক হারে সরল ও ঋজু দণ্ডের ব্যবহার হবে শব্দসমষ্টির এক চতুর্থাংশ এবং গোলাকার বর্ণ ও আনুভূমিক বাহুর ব্যবহার হবে তিন চতুর্থাংশ, তবে তাওকী হবে বলিষ্ঠ ও স্পষ্ট এবং রিকা হবে খদী বা ক্ষীণ ও সরু।২১ ইবনে মুকলার উদ্ভাবিত এই ছয়টি পদ্ধতি ভালোভাবে সমাদৃত হয়। পরবর্তীকালে শিলালিপি ও মুদ্রালিপি হিসেবে এই ছয়টি পদ্ধতি কুফী লিপি পদ্ধতির স্থলাভিষিক্ত হয়।২২

নাসতালিক পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণের গোলাকার পরিসরকে বিস্তৃত করা হয় ও বাকসমূহকে চালু করা হয় এবং তা বিশেষভাবে শব্দ ও বর্ণের শেষ প্রান্তে লক্ষ্য করা যায়। লিপিমালাকে উত্তাল তরঙ্গের মধ্যভাগের ঢালু পরিসরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। উপরন্তু সরলীকরণের মাধ্যমে কোনো কোনো বর্ণের দাঁত লোপ করে কলম এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে, তার ক্রমশ চালুরূপ লেখার ত্বরিত গতিতে সহায়তা করে। আরবি লিখনপদ্ধতিতে কুফী এবং নাস্‌খ ও তার স্বগোত্রীয় সুল্‌স, মুহাক্‌কাক ও রায়হান, তাওকী ও রিয়া এবং ফারসি লিখন পদ্ধতিসমূহের মধ্যে এই নাসতালিক পদ্ধতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর দিকে নাবাতীয় লিখনপদ্ধতি হতে সম্ভবত পেটরা এবং হিজয় শহরে আরবি লিখনপদ্ধতি জন্ম লাভ করে।২৩ উপরন্তু বলা হয়ে থাকে যে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত হীরা শহরে আরবি লিখনপদ্ধতির জন্ম। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, হিজায প্রদেশে আরবি লিখনপদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। অনেকের মতে নাবাতীয় বর্ণমালা হতে পাশাপাশি কৌণিক লিখনপদ্ধতি কুফী এবং গোলাকার লিখনপদ্ধতিতে নির্গত হয়েছে। তারপর লিখনপদ্ধতি উত্তর হিজাযের মক্কা ও মদীনায় প্রসার লাভ করে এবং কুফী লিখনপদ্ধতি মেসোপটেমিয়ায়, কুফা ও বসরা শহরে বিস্তার লাভ করে।

স্থূলভাবে বলা যায় যে, কৌণিক বক্রাকৃতি ও গোলাকার নাবাতীয় লিখনপদ্ধতি, সিরীয় পদ্ধতির বিন্দু ও স্বরচিহ্ন এবং মাকালী লিখনপদ্ধতির লম্ব দণ্ড সমীকরণের মাধ্যমে আররি লিখনপদ্ধতির একটি পূর্ণ কাঠামো সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৌণিক ও গোলাকার বর্ণ বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে কুফী লিখনপদ্ধতির উদ্ভব হয়। অনেক পণ্ডিত মনে করেন কুফা শহরে কৌণিক লিখনপদ্ধতি  প্রথমে ব্যবহার হবার কারণে তা কুফী নামধারণ করে। তুমার লিখনপদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণমালার লম্বদণ্ড ও আনুভূমিক বাহু আনুপাতিক হারে খর্বাকৃতি এবং কলমে পরিপূর্ণ কালি ব্যবহার করে ও তার মোটা অগ্রভাগ দিয়ে লেখার কাজ সম্পন্ন করা হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে সিরিয়ায় নির্মিত একটি পিতলের দস্তানায় তুমার পদ্ধতির লেখা দেখতে পাওয়া যায়। গুবায় লিখনপদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণমালার উল্লম্ব দণ্ড ও আনুভূমিক বাহু অতি ক্ষীণ ও সরু। অক্ষরগুলোকে অনেকটা ভাসমান ধূলিকণার মতো প্রতীয়মান হয়। বিহার লিখনপদ্ধতিতে ব্যবহৃত বর্ণমালার দণ্ড ও সমান্তরাল রেখা আনুপাতিক হারে যথাক্রমে খর্বাকৃতি ও হ্রস্ব। অক্ষরের বাঁক কিছুটা কোণ সৃষ্টি করলেও ঢালু গতিতে রূপান্তর করা যায়। লিপির অন্তর্ভুক্ত অক্ষরের উল্লম্ব দণ্ড অথবা সমান্তরাল বাহু অন্য অক্ষরের অনুরূপ দণ্ড অথবা বাহুর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে কিংবা লিপির সারির উপরাংশে, মধ্যাংশে ও নিম্নাংশে অথবা অক্ষর সমষ্টির উতকীর্ণের দ্বারা লিখন শিল্পিগণ যে প্রাণবন্ত, গতিময় লিখনশৈলীর সৃষ্টি করেন তা লিখনশিল্পীর পরিভাষায় তোগরা পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত হয়। এটি কোনো স্বতন্ত্র লিখনপদ্ধতি নয়; বরং লিখনশৈলীর অলংকরণ হিসেবে মনে করা হয়।২৪

আরবি লিখনশৈলীর অলংকরণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি পরিলক্ষিত হয়, যেমন- গুলযার, প্রথমে সীমানা নির্ধারণ করে ফুল-ফল, লতাপাতা এবং মাছ জাতীয় হলে মাহী আর ময়ূর জাতীয় হলে তাউস পদ্ধতি মনে করা হয়। বর্ণমালার বক্রাকৃতি রেখা কুঞ্চিত হয়ে ছোট গিরা সৃষ্টি করলে এবং কলমের আঁচড় প্রশস্ততার দিকে ক্ষীণ ও সূঁচালো আকারে ধারণ করলে তাকে যুলফী আরূস লিখনপদ্ধতি বলে। লারযা পদ্ধতির অক্ষরগুলো আঁকাবাঁকা গাছের শাখাপ্রশাখার মতো অর্থাত উত্তেজনাবশত কল্পিত হাতে লিখলে যেমন হয়। মানশুর বর্ণমালাকে মনে হয় যেন রেশমি ফিতাকে ভাঁজ করে প্রতিটি অক্ষর সৃষ্টি করা হয়েছে এবং অক্ষরের শেষাংশ মোড়ানো এবং দেখতে অনেকটা ঝালরের ভাঁজরূপ। আরবি লিখনশৈলিতে আরো অনেক ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো হলো শিকাসতা, শাফিয়া হিলানী ইত্যাদি।

মুঘল সম্রাটগণের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে হস্তলিখনশিল্পের প্রভূত উন্নতি হয়েছিল। তাঁদের সহযোগিতায় লিখনশৈলীর উন্নতি হলে প্রখ্যাত লিপিবিশারদগণ বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। এসব উপাধির মধ্যে যাররীন কলম, বাদশা কলম, শিরীন কলম, আলবারীন কল, রওশন কলম এবং মুশকীন কলম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সামাজিক মর্যাদায় লিখনশিল্পী

মহানবী (সা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে উমাইয়্যা যুগ পর্যন্ত হস্তলিখন শিল্প সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে শিল্পীদের হাতে অপ্রতিরোধ্যভাবে বিকাশ লাভ করেছে। আব্বাসী আমলে লেখার উপকরণ হিসেবে কাগজের উদ্ভাবন হলে আরবি লিখনশৈলিতে প্রভূত পরিবর্তন সাধিত হয়। ফলে লিখনশৈলিকে অনেকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। আগেই বলা হয়েছে যে, যাঁর হস্তলিপি যত সুন্দর তিনি সমাজে তত অধিক মর্যাদাশালী এবং ধনবান ব্যক্তি হতেন। এমনকি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদেরকে জায়গীর এবং ইকতা বরাদ্দ করা হতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সেই আমলে বিক্রয়যোগ্য পুস্তকের অনুলিপি প্রস্তুত করে একজন হস্তলিপিকার দৈনিক তিন থেকে চার টাকা সমপরিমাণ প্রচলিত মুদ্রা অর্জন করতে পারতেন।২৫

এভাবে শিল্পীদের লেখনি দ্বারা রাজকীয় ফরমান, সনদ, সন্ধি, পাট্টা, দান, উপদেশ, ধর্মীয় বাণী, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্য, রাজকীয় যোগাযোগের চিঠিপত্র, নিমন্ত্রণ পত্র, দলিল-দস্তাবেজসহ যে কোনো ধরনের পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি লেখা হতো। লিখনশিল্পীদের সুহস্তলিপিসমৃদ্ধ না হলে সে যুগের জ্ঞানভাণ্ডার আমাদের কাছে আজও হয়তো অবরুদ্ধ থেকে যেত। বাহাউদ্দৌলার মন্ত্রী শাপুর বিন আরদাশীরের গ্রন্থাগারে এসব পুরানো হস্তলিপির প্রায় দশ হাজার এবং ত্রিপোলিতে বানু আম্মার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ফাতেমী গ্রন্থাগারে প্রায় ত্রিশ লক্ষ গ্রন্থ এবং স্পেনের গ্রানাডা নগর গ্রন্থাগারে চার লক্ষাধিক গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল।২৬ মিশরের আযীযবিল্লাহ তাঁর গ্রন্থাগারে ব্যবহারের জন্য প্রায় ষোল লক্ষ গ্রন্থ সংগ্রহ করেন।২৭ স্পেনের শাসক দ্বিতীয় হাকাম শিক্ষা সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান গ্রন্থ সংগ্রহের জন্য কায়রো, বাগদাদ, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়াতে লোক প্রেরণ করে তাঁর গ্রন্থাগারের সংগ্রহকে সমৃদ্ধশালী করে তুলেছিলেন।

দিল্লীর মামলুক সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ একজন উঁচু দরের হস্তলিখন শিল্পী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে কুরআন শরীফ নকল ও টুপি সেলাই করে এবং বাজারে বিক্রি করে যা পেতেন তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। রাজপ্রাসাদ হতে কোনো কিছুই নিজের জন্য গ্রহণ করতেন না।

বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ভ্রমণের এক সময়ে দিল্লিতে আসলে তিনি তাঁকে হস্তলিখিত কুরআন শরীফ দেখিয়েছিলেন।২৮ সুলতান ফিরুয শাহ একজন বিদ্বান এবং দক্ষ লিপিকার হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি বিহার লিখন পদ্ধতিতে কুরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করতেন। তাঁর হস্তলিখিত একটি কপি বর্তমানে দিল্লির প্রত্নতাত্ত্বিক যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।২৯

সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশিকো এবং সম্রাট আলমগীরের কন্যা, আবদুর রশীদ দায়লামী (আ কা রশীদ)-এর নিকট থেকে হস্তলিখনশিল্পের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দক্ষতা অর্জন করেন। মুঘল আমলে সম্রাট পরিবারের সদস্যগণ মোটামুটিভাবে দক্ষ ওস্তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের অলংকৃত ও সমৃদ্ধ আরবি লিখনশৈলী শিখতেন। শিক্ষক বা ওস্তাদদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিক সম্মানের চোখে দেখা হতো। এ কারণে বোধ করি লিখনশিল্পে মুঘল বাদশাদের কৃতিত্ব ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। স্বর্ণকার, কর্মকার, মৃতশিল্পী, বয়নশিল্পী, মুদ্রাকর এবং কাঠ ও পাথরে উতকীর্ণ শিল্পীর জন্য সুহস্ত লিখনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছিল অত্যাবশ্যক। নানা শিল্পকর্মে শিল্পীরা একান্ত আপন চেষ্টার সাথে হস্তলিখনে সুস্পষ্ট দক্ষতার ছাপ রেখেছেন।

সম্রাট জহিরউদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর হতে শুরু করে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ পর্যন্ত সকল সম্রাটই হস্তলিখন শিল্পে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সম্রাট আকবর, সম্রাট শাহজাহান এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে আরবি লিখনশৈলীর বিভিন্ন পদ্ধতি এবং বিশেষ করে নাসতালিক লিখনপদ্ধতির পূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। সম্রাট আলমগীর একজন উঁচুমানের লিখনশিল্পী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে সুন্দর লিখনশৈলী দিয়ে কুরআনের অনুলিপি করতেন এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে সংসার চালাতেন। প্রতি বছর রাজদরবারের কাজের অবসরে সুন্দর হস্তাক্ষরে নিজের হাতে কুরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করে এবং মনোরম বাঁধাই করে দুটি কপি তিনি মদীনায় পাঠিয়ে দিতেন। যার প্রতিটি কপির মূল্য ছিল পাঁচ হাজার টাকার সমমানের।

ক্যালিগ্রাফি বা সুন্দর হস্তলিখন শিল্পের সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিশ্বাস সংক্রান্ত আরবি বাক্য, খ্রিস্টান শাসকদের নির্দেশ তাদের মুদ্রা ও স্থাপত্যে অনায়াসে উপস্থাপিত হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, অষ্টম শতাব্দীর মারসিয়ার খ্রিস্টান শাসক অফফা তাঁর মুদ্রায় কুফী লিখনপদ্ধতির অলংকরণ বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল রেখে কালিমা উতকীর্ণ করেন। অনুরূপভাবে নবম শতাব্দীর ব্রোঞ্জ নির্মিত একটি আইরিশ চিত্রের মধ্যস্থলে কুফী লিখনপদ্ধতিতে ‘বিসমিল্লাহ’ উতকীর্ণ হয়েছে। আরবি বর্ণমালার লিখনশৈলীর অলংকরণ বৈশিষ্ট্য খ্রিস্টান লিখনশিল্পীদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফলশ্রুতি হিসাবে মধ্যযুগের ইতালী, স্পেন এবং ফ্রান্সের খ্রিস্টান গির্জা এবং সমাধি সৌধের স্থাপত্য অলংকরণে এরাবেক্স মটিফ এবং আরবি অলংকৃত লিখনপদ্ধতির সুকুমার ধারা উপস্থাপিত হয়েছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লিখনশিল্পিগণ আরবি লিখনশৈলীর প্রতি অনুরক্ত কিংবা বিমোহিত হয়ে গির্জার প্রাচীরগাত্রে কুফী লিখনপদ্ধতিতে কুরআনের আয়াত উতকীর্ণ করতেন।৩০ সেন্ট পিটারের গির্জার সুউচ্চ প্রবেশ পথের প্রাচীর গাত্রে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্বলিত বক্তব্য সুহস্ত লিখনে উতকীর্ণ রয়েছে। আরবি হস্তলিখন শিল্পের গতিশীল এবং আলংকারিক বৈশিষ্ট্য তাদের তুলনায় উতকৃষ্ট কিংবা শোভায় নয়নাভিরাম বিবেচিত না হলে খ্রিস্টান গির্জায় ও সমাধি সৌধে তা হয়তো কখনই স্থান পেত না।৩১

এম. এস. ব্রীগ্‌স মন্তব্য করেন যে, নবম শতাব্দীর কায়রোর ইবনে তুলুনের মসজিদের আরবি লিখনশিল্পের অলংকরণ বৈশিষ্ট্যের প্রভাব পরবর্তী গোত্রীয় স্থাপত্যের অলংকরণে লক্ষ্য করা যায়।৩২ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশে স্থাপত্য অলংকরণ প্রক্রিয়ায় সুন্দর আরবি হস্তলিখন শিল্প প্রভৃতি বিস্তার লাভ করেছে। ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবের ক্যালিগ্রাফির কোন কোন অংশের অলংকরণ প্রক্রিয়ায় মুসলিম হস্তলিখন শিল্পের অলংকরণ বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে বলে প্রফেসর লেঘারী মনে করেন। সিরিয়া, মুসেল, মিশর এবং পারস্যের রাই, ইসফাহান এবং বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ ও পিতল ধাতবে নির্মিত আহার পাত্র, প্রদীপ, ফুলদানি, দোয়াত, ঝুড়ি, যুদ্ধের অস্ত্র, তলোয়ার, গদা-গুরুজ, কোচা এবং যুদ্ধের হেলমেট ইত্যাদির অবয়বের অলংকরণে সুন্দর সুন্দর হস্তলিখন পদ্ধতির অবয়ব লক্ষ্য করা যায়।৩৩ বিশ্বের বিভিন্ন যাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন দ্রব্যাদির ওপর সুন্দর হস্তলিখন শিল্পের আরো উদাহরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অলংকরণ এবং সাজ-সজ্জার উপকরণ হিসাবে লিখনশিল্পকে কাজে লাগাতে শিল্পিগণ কখনো কোন শৈথিল্য প্রদর্শন করেননি। বিশেষভাবে আরবি বর্ণমালার লম্বদণ্ড ও বক্রাকৃতি রেখার সম্প্রসারণ ও সরলীকরণের সম্ভাবনা তাঁদের অলংকরণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ বৃদ্ধি করেছে।

বর্তমান যুগে ইসলামী ক্যালিগ্রাফি ইতিহাসের নিদর্শনের দিকে তাকালে পৃথিবীর বিভিন্ন যাদুঘরে এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহের যাদুঘরগুলোতে কিছু কিছু নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। সেভাবে আমাদের জাতীয় যাদুঘরের কথা এসে যায়। বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরে মহাকবি ফেরদৌসী রচিত শাহনামা, নিযামী কর্তৃক ৯৯৯ হিজরিতে লিখিত ‘মাখজানুল আসরার’ রয়েছে। মুঘল সম্রাট আলমগীরের আমলে ইসলাম ধর্মের বিধান সংক্রান্ত গ্রন্থ ‘ফতোয়া-ই-আলমগীরী’ সহ অনেক সুন্দর সুন্দর হস্তলিখিত অলংকৃত লিপি দেখতে পাওয়া যায়। অপরদিকে বিভিন্ন ধাতব পাত্রে নির্মিত শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত কুঠার, ফিরাংগী, জম্বির, শামশির, আরাগুপ্তা কিরীচ, সুখেলা এবং গদা প্রভৃতিতে আরবি ক্যালিগ্রাফি দেখা যায়। অপরদিকে চীনামাটির থালা-বাসন, গ্লাস, কাপ-পিরিচ ইত্যাদিতে আরবিতে বিভিন্ন সূরার আয়াত লেখা হয়েছে এবং সেসব নিদর্শন অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে থরে থরে সুন্দরভাবে গ্যালারিতে দর্শকদের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে।

আরবি অলংকৃত লিপিশৈলীর ইতিহাসে কাগজ অনেকখানি স্থান জুড়ে রয়েছে। এ কারণে আলোচ্য নিবন্ধে কাগজের উদ্ভবের ক্রমবিকাশ ধারা একটু আলোকপাত করা হচ্ছে। ‘কাগজ’ ফারসি শব্দ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাগজের নাম রয়েছে। যেমন, আরবরা কিরতাস, ইংরেজরা পেপার, জার্মান কিংবা ফ্রেঞ্চরা পেপিয়ার, ল্যাটিনরা প্যাপিরাস৩৪, গ্রীকরা প্যাপুরস বলে। শব্দটি আসলে মিশরের। মিশরীয়রা তাকে প্যাপিরাস বলত।৩৫ সাইলুন (Ts’ai Lun) তন্তুজ মণ্ড থেকে কাগজ প্রস্তুত করে। অতঃপর মণ্ড থেকে উন্নত হয়ে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে জাপানে, ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে সমরকন্দে, ৯০০ খ্রিস্টাব্দে মিশরে, ১১৫০ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে, ১২৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইটালিতে, ১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে, ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে ক্রমাগতভাবে উন্নততর হতে হতে অবশেষে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় প্রথম আধুনিক কাগজের কল স্থাপিত হয়।৩৬

চীনদেশে ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম কাঠের ওপর খোদাই করে টাইপ বানিয়ে ছাপ নেয়া হতো। ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির গুটেনবার্গ স্থানান্তর উপযোগী টাইপ উদ্ভাবন করেন। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ম্যাজারিন বাইবেল মুদ্রিত হয়। ছাপাখানার দ্রুত প্রসারে ১৪৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইটালিতে, ১৪৬৮ খ্রিস্টাব্দে সুইজারল্যান্ডে, ১৪৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে, ১৪৭৩ খ্রিস্টাব্দে হল্যান্ডে, ১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে ছাপাখানা স্থাপিত হয়। ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ছাপাখানা প্রবর্তন করে পর্তুগীজরা। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে ৭ সেপ্টেম্বর পোলায়েত মুদ্রণ যন্ত্র আনার পর ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পুস্তক ছাপা হয়। ১৪৪৩ খ্রিস্টাব্দে লিসবনে ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক, ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজে, ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে ‘গ্রামার অব দি বেংগল ল্যাংগুয়েজ’ নামক গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়। ছাপাখানায় গ্রন্থ, দলিলপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মুদ্রিত হতে লাগল।

মুদ্রণযন্ত্র ও লিথোটাইপ পদ্ধতির আবির্ভাবের ফলে হস্তলিখনে লিপিকলার প্রয়োগ ও কার্যকারিতা হ্রাস পেতে শুরু করে এবং এই শিল্পের তাতপর্য কিংবা গুরুত্ব ক্রমশ লোপ পায়। এসব আরবি হস্তলিপি আজ দেশের বিভিন্ন যাদুঘরে ঠাঁই নিয়েছে নিভৃতে শো-কেসের বাক্সে। এই আরবি অলংকৃত লিপি (Calligraphy) আজ আমাদের কাছে সত্যিই এক ইতিহাস হয়ে রয়েছে। তবুও বলতে হয় এক সময় আরবি ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস জগদ্বিখ্যাত ছিল। অতএব, ডেকোরেটিভ বা অলংকৃত হস্তলিখন শিল্পের অবদান ঐতিহাসিক পর্যালোচনার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ।

টীকাসমূহ

১. এ. কে. এম. ইয়াকুব আলী : মুসলিম মুদ্রা ও হস্তলিখন শিল্প, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৯ ইং, পৃ. ২৯৭-২৯৮

২.  P.K. Hitti, History of the Arabs, London, McMillan & Co. LTD. 9th edition, 1968. Page 71

৩. মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম : পাণ্ডুলিপি পাঠ ও পাঠ সমালোচনা, বাংলা একাডেমী, ১৯৭৬, পৃ. ১৬৫

৪. মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : পাণ্ডুলিপি : সচিত্র বাংলাদেশ, ১১ বর্ষ, ১০ সংখ্যা, ৩০ এপ্রিল, ১৯৯০, পৃ. ২৪

৫. মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম : আরবি লিপির উতপত্তি ও ক্রমবিকাশ : দৈনিক ইনকিলাব, ১৯ জুলাই, ১৯৮৭, পৃ. ৬, কলাম নং ৫-৮

৬. আল-কুরতুবী আল-কাস্‌দ : মাকতাবা আল-কুদ্‌সী, কায়রো, ১৩৫০ হিজরি, পৃ. ১১, ১৯-২০

৭. আল-কুরআন : সূরা আল-বাকারা, আয়াত নং ৩০

৮. Qadi Ahmed : Gulistan-i-Hunr, Tr. By: T. Minorsky, Calligraphers and painters. Page 52

৯. আল-কুরতুবী, আল-কাস্‌দ : প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা নং ১৭

১০. Abdul Fadi Allami : Ain-i-Akbari; Vol-1, Tr. By: H. Blochmann. Calcutta. Asiatic Society of Bengal: 1973. Page 99

১১. T.W. Arnold : Painting in Islam, New York; 1965, Page-2

১২. আল-কুরআন : সূরা আল-আলাক : আয়াত ১-৪

১৩. Qadi Ahmed : Ibid. Page 49

১৪. এ. কে. এম. ইয়াকুব আলী : প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০২

১৫. K.S.M. Zafar Hasan: Specimen of Calligraphy in the Delhi Museum of Archaeology, No 29:1926: Page 1.

১৬. তালাতবে : তারীখ সুয়াল-ই-আরব, এলাহাবাদ, ১৩১৫ হিজরি, পৃ. ৫৮

১৭. Qadi Ahmed: Ain-i-Akbari, Vol. 1, Page 99

১৮. Al Nadim: Kitab-at-Phirist, Page 91, 125 & 130

১৯. Qadi Ahmed: Ibid, Page 56

২০. M. Ziauddin: Moslem Calligraphy, Calcutta, 1936, Page 60

২১. Qadi Ahmed: Ain-i-Akbari, Vol. 8, Page 57

২২. এ. কে. এম. ইয়াকুব আলী : প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১৪

২৩.  D. Diringer: The Alphabet, London, 1947, Page 271

২৪. Douglass Barret: Islamic Metal Work in the British Museum: London; The Trustees of the Museum, 1949, Page 22

২৫. M. Ziauddin: Ibid, Page 31

২৬. M. Ziauddin: Ibid, Page 35

২৭. ইবনে খালদুন : তারীখ, কায়রো, ১২৮৪ হিজরি, ভলিউম ৪, পৃ. ৮১

২৮. Ibn Batuta: Rihla: Tr. By Agha Mahdi Husain: Baroda, 1983. Page 35

২৯. Memoirs of Archaeological Survey of India, No. 29, Specimen No. 3

৩০. এ. কে.এম. ইয়াকুব আলী : প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা নং ৩৪০

৩১. S.P. Scott: History of the Moorish Empire in Europe. Vol No. 111, Ch. 29

৩২. The Legacy of Islam. 1931, Page 178

৩৩. Douglass Barret: Ibid: Plate No’s 14, 22, 24, 28, 30, 31.

৩৪. The Compact Edition of the Oxford English Dictionary: Vol. 11, 1972.

৩৫. Encyclopaedia Britannica, Vol. 13, 15th Edition. Page 968

৩৬. The New Columbia Encyclopaedia, 4th Edition. Page 2062